করোনা মোকাবিলায় ঠিকমতো হচ্ছে না ৬টি কাজ

0
17
করোনা মোকাবিলায় ঠিকমতো হচ্ছে না ৬টি কাজ
করোনা মোকাবিলায় ঠিকমতো হচ্ছে না ৬টি কাজ

নিউজ ডেস্ক:  করোনা মহামারি মোকাবিলায় ছয়টি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। কাজগুলো ঠিকমতো হয়নি। এসব পদক্ষেপের সঙ্গে গোটা সরকারব্যবস্থা যুক্ত থাকার কথা। দেশে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ নিয়ে বেশি কথা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যান্য মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার সম্পৃক্ততা বাড়ানো দরকার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৬ এপ্রিলের অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশিকায় জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক বিষয়ে ছয়টি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছিল। এর মধ্যে ছিল: সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, জনবলসহ সেবাপ্রতিষ্ঠান প্রস্তুত রাখা, জনপরিসরে জনসমাবেশ কমানো, কর্মস্থলে প্রতিরোধব্যবস্থা নেওয়া, বিদেশে আসা–যাওয়া করে এমন ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করা। শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নয়, মহামারি মোকাবিলায় গোটা সরকারব্যবস্থাকে যুক্ত থাকার কথা বলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

একাধিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ছয়টি কাজের কোনোটিই ঠিকমতো হয়নি। বেশ কিছু মন্ত্রণালয়ের কার্যকর সম্পৃক্ততা নজরে পড়েনি। লকডাউনের সিদ্ধান্ত ছিল চাপিয়ে দেওয়া, এর সুফল বিষয়ে মানুষের ধারণা স্পষ্ট ছিল না। তাই মানুষ কার্যকরভাবে সাড়া দেয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মহামারি মোকাবিলার বিষয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং দেখছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের কাজে যুক্ত। সুতরাং গোটা সরকারব্যবস্থাই এখন এই কাজে জড়িত। এটা শুধু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব না।’

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, দুটি পরিপূরক পন্থায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। প্রথমটি হচ্ছে সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করা, পরীক্ষা করা, আইসোলেট (বিচ্ছিন্ন করা) করা, চিকিৎসা দেওয়া ও সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিকে কোয়ারেন্টিন (সঙ্গনিরোধ) করে সংক্রমণের পথ বন্ধ করা। দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে পর্যবেক্ষণ, জরিপ, রোগতাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া।

করোনা পরীক্ষার দুর্বলতা শুরু থেকেই আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দৈনিক কমপক্ষে ২০ হাজার পরীক্ষা দরকার। ৬০টির বেশি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা চললেও কোনো দিন ২০ হাজার পরীক্ষা হয়নি। দেশের ৪৩ জেলায় ল্যাবরেটরি নেই। ৮০ শতাংশের বেশি রোগী বাড়িতে আইসোলেশনে থাকে। এসব রোগী সংক্রমণ ছড়াচ্ছে কি না তা কেউ দেখছে না। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে আছে অভিযোগ। আক্রান্তের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার কাজটি বন্ধ ছিল, এখন সীমিত পর্যায়ে হচ্ছে।

রোগতাত্ত্বিক কোনো গবেষণা বা জরিপের ফলাফল এখনো জানা যায়নি। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) সহায়তায় দেশব্যাপী একটি জরিপ করছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।

জনবল ও প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতি

সন্দেহভাজন ব্যক্তি চিহ্নিত করতে, পরীক্ষা করতে, রোগীদের হাসপাতালে সেবা দিতে, আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ (কনট্যাক্ট ট্রেসিং), সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ওপর নজরদারির জন্য জনস্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবল দরকার। রোগী বাড়লে হাসপাতালগুলো পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে কি না, এমন মূল্যায়ন দরকার। প্রতিটি স্বাস্থ্যকর্মীকে সংক্রমণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই) দিতে হবে। ঝুঁকি, কর্মকাণ্ড এবং পরিস্থিতির অগ্রগতি মূল্যায়নে শক্তিশালী তথ্য ব্যবস্থা থাকা দরকার।

করোনা মোকাবিলা শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের কাজ নয়। অন্যান্য মন্ত্রণালয়কে আরও উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে–নজির আহমেদ বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য সব সময় উপেক্ষিত। এই খাতে বাজেট বরাদ্দ কম থাকে। জনবল গড়ে তোলারও আন্তরিক উদ্যোগ নেই। এই শূন্যতা মহামারির সময় প্রকট হয়ে উঠেছে।’

১১০টি হাসপাতালে করোনার চিকিৎসা হচ্ছে। শয্যাসংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম, পর্যাপ্ত আইসিইউ শয্যা নেই। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবলের ঘাটতি আছে। পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত টেকনোলজিস্ট নেই। জনবলের অভাবে কনট্যাক্ট ট্রেসিং হচ্ছে কম। অন্যদিকে শক্তিশালী তথ্যব্যবস্থা তো দূরের কথা, সাধারণ তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে না। যা পাওয়া যাচ্ছে তাতে নানা ভুলত্রুটি আছে।

জনপরিসরে সমাবেশ কমানো

শারীরিক দূরত্ব মানলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাড়িতে ও হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধে এই দূরত্ব বজায় রাখা নিশ্চিত করতে হবে। সিনেমা বা থিয়েটার হল, হোটেল, নৈশক্লাব, ব্যায়ামাগারে ভিড় কমাতে হবে। গণপরিবহন, বিপণিবিতান, স্কুল–কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ–মন্দির, স্টেডিয়াম—এসব জায়গা ঝুঁকিপূর্ণ।

বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিরা কতটুকু সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলছেন, সেই তথ্য নেই। অন্য ক্ষেত্রগুলোতে সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে ১৮ মার্চ থেকে। কিছুদিন মসজিদে নামাজ আদায় বন্ধ ছিল। হোটেল ও বার বন্ধ ছিল। গণপরিবহন বন্ধ ছিল, এখন শর্ত সাপেক্ষে চালু হয়েছে। সরকার ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। তারপর কয়েক দফায় তা বাড়ায়। ৩১ মে থেকে ‘সীমিত আকারে’ সরকারি বেসরকারি অফিস খুলেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। পদক্ষেপগুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়িত হলে আরও ভালো ফল পাওয়া যেত।

কর্মস্থলে প্রতিরোধ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্মস্থলে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা, হাত ধোয়া, কাশি শিষ্টাচার মেনে চলতে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করার কথা বলেছে। ভিড় কমানোর জন্য বাড়িতে থেকে কাজ বা কাজের পালায় পরিবর্তনসহ অন্য বিকল্পের কথাও ভাবতে হবে।

এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি কথা হয়েছে পোশাকশিল্প নিয়ে। সরকার পোশাকশিল্পসহ সব শিল্পকারখানা বন্ধ করেছিল। ২৬ এপ্রিল থেকে সব পোশাক কারখানা চালু হয়ে যায়, সঙ্গে কলকারখানাও।

৫৭ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বাস্থ্য নির্দেশিকা তৈরি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত কোভিড–১৯ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। এখন কর্মক্ষেত্রে বহু মানুষের মুখে মাস্ক দেখা যাচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে সাবান–পানি দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। বাড়িতে থেকে অফিসের কাজ কিছু প্রতিষ্ঠানে চালু করেছে।

বিদেশফেরতদের পরীক্ষা

আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোতে বিদেশগামী ও বিদেশফেরত যাত্রীদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং সন্দেহভাজনদের কোয়ারেন্টিন করা গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এ জন্য বন্দর কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা থাকা দরকার।

কাজটি শুরু থেকেই ঠিকমতো হচ্ছে না। বন্দরগুলোতে স্বাস্থ্যপরীক্ষার যন্ত্রের ঘাটতি ছিল, ছিল দুর্নীতির অভিযোগ। প্রতিদিন মানুষ আসছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আন্তর্জাতিক স্থল, বিমান ও সমুদ্রবন্দর দিয়ে ১ হাজার ১৫২ জন ব্যক্তি বাংলাদেশে এসেছেন।

এদের কোয়ারেন্টিন নিয়ে সন্দেহ আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেছেন, তাঁর দুজন আত্মীয় সম্প্রতি বিদেশ থেকে এসেছেন। তাঁরা বাড়িতে কোয়ারেন্টিনে আছেন কি না, তা কেউ জানতে চায়নি বা বাসায় দেখতে আসেনি।

জনগণের সম্পৃক্ততা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, চলাচল বন্ধের বড় সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে পরীক্ষা, আইসোলেশনসহ সব ক্ষেত্রেই জনসাধারণের সম্পৃক্ততা দরকার। কখন জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক ব্যবস্থা বলবৎ হবে এবং কখন উঠে যাবে, তা নিয়মিতভাবে মানুষকে জানাতে হবে এবং তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। রোগের মহামারির সময় তথ্যেরও মহামারি (ইনফোডেমিক) দেখা দেয় বলে মানুষের বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ থাকে। ঠিক সময়ে ঠিক তথ্য দিলে মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। একে মহামারি মোকাবিলায় সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে দেখতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর স্বাস্থ্য বুলেটিনে পরীক্ষার সংখ্যা, পরীক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা, নমুনা সংগ্রহের সংখ্যা, আক্রান্তের সংখ্যা, সুস্থ হওয়ার সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ করে। পাশাপাশি আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টিনে থাকার সংখ্যাও প্রকাশ করে। বিদেশ থেকে আসা মানুষের সংখ্যাও থাকে। আর থাকে পিপিই সংগ্রহ ও বিতরণের তথ্য।

সাধারণ মানুষসহ বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিদদের একটি অংশ সরকারি তথ্যে আস্থা রাখতে পারছেন না। সাধারণ মানুষের সঙ্গে পরামর্শ করে করোনা মোকাবিলায় সরকার কোনো উদ্যোগ নিয়েছে, এমন নজির নেই।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, মহামারি মোকাবিলায় স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, দুর্যোগ, স্থানীয় সরকার, তথ্যসহ আরও অনেক মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা আছে। সবাই আরও উদ্যোগী হলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হবে। মানুষকে সম্পৃক্ত করে কাজ করতে হলে তাকে ঠিক তথ্য দিতে হবে।