সর্বশেষ সংবাদ

রাজস্ব সার্কেলের জুনিয়র সার্ভেয়ার মোঃ শফিউল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগের

ফায়সাল বিন সিদ্দিক
ঢাকাস্থ ক্যান্টনমেন্ট রাজস্ব সার্কেলের জুনিয়র সার্ভেয়ার মোঃ শফিউল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। একের পর এক অভিযোগ হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছেনা মোঃ শফিউল আলমের বিরুদ্ধে।
ঢাকাস্থ ক্যান্টনমেন্ট রাজস্ব সার্কেলের জুনিয়র সার্ভেয়ার মোঃ শফিউল আলম ভূমি মন্ত্রনালয়ের পরিপত্র (স্মারক নং ৩১.০০.০০০০.০৪৬.৬৮.০৩৯.১২.৪৪৮ ; তাং ২৫শে মে, ২০১৭) বিভাগীয় কমিশনার, ঢাকা এর কার্যালয়ের নির্দেশনা (স্মারক নং ০৫.৪১.৩০০০.০০৯.০৬.০৪৮.১৪.-৩৯৬ (১৩) তাং- ১৬-০৬-২০১৬) এবং জেলা প্রশাসক, ঢাকা- এর ৯-৭-১৯ ইং তারিখের পরির্দশন প্রতিবেদন উপেক্ষা ও অমান্য করে ঐ সার্কেলের সবচেয়ে জুনিয়র সার্ভেয়ার মোঃ শফিউল আলমকে ভারপ্রাপ্ত কানুনগো দায়িত্ব প্রদান করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, রহস্যজনক কারণে তাকে আরো দু’টি পদ পেশকার ও সার্ভেয়ারের দায়িত্ব সে পালন করছে অর্থাৎ শফিউল আলম একই সাথে দীর্ঘদিন যাবৎ ভারপ্রাপ্ত কানুনগো, পেশকার ও সার্ভেয়ারের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে এ যাবৎ একাধিক অভিযোগ হয় বলে জানা গেছে। ভূমি অধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা থেকে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে মোঃ শফিউল আলমের বিরুদ্ধে। এছাড়াও ইউসুফ আহমেদ ও মোঃ আবু ফাত্তাহ নামে দুই ব্যক্তিও ভূমি মন্ত্রী, জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ দায়ের করেন বলে জানা গেছে।
ভূমি অধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ভূমি মাঠ প্রশাসনের ঢাকাস্থ অন্যতম গুরুত্বপূর্ন ক্যান্টমেন্ট রাজস্ব সার্কেলের সার্ভেয়ার শফিউল আলমের যোগসাজেসে ঢাকা শহরের তিনটি মৌজায় সরকারী মালিকাধীন বিভিন্ন সংস্থার ১.৩৭৫ একর জমির নামজারি করা হয়েছে বিভিন্ন ব্যাক্তির নামে। আর সরকারী এসব সংস্থার মধ্যে খোদ ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ভূমি সংস্কার বোর্ড ও বিশ্ব ইজতেমার মাঠের জমি (যা রাজউকের নামে রের্কডকৃত) সম্পত্তি রয়েছে।
এ ব্যাপারটি ভূমিতে জনগণের অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারী সংস্থা- ভূমি অধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা বিষয়টি অবহিত হলে ০১ জুলাই ২০১৯ উক্ত সংস্থার মহা সচিব মোঃ হেমায়েত হোসেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে অভিযোগ করলে ভূমি মন্ত্রণালয় স্মারক নং- ৩১.০০.০০০০.০৪৬.১২৪.১২.৪৫১ মূলে ঢাকার জেলা প্রশাসককে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেয়।
অভিযোগে বলা হয়, রাজধানীর দক্ষিনখান মৌজার সি এস/এস এ, দাগ নং- ১৬৩, এস এ খতিয়ান নং- ৪৭৬, আর এস খতিয়ান নং- ১৩৮০৩০০, আর এস দাগ নং- ২৩০ এবং ২৩৪, এবং মহানগর জরিপ দাগ নং- ৭৩৩৬ এর ০.১৫৭৬ একর সম্পত্তি গেজেটভুক্ত অর্পিত সম্পত্তির “ক” তফসিল বর্ণিত সম্পত্তি। উক্ত সম্পত্তি গত ০৪ অক্টোবর ২০১৯, তারিখ ২৮৯৮/১৮-১৯ নং নামজারি কেসমূলে মোঃ আনোয়ার হোসেন গং এর অনুকুলে নামজারি করা হয় যাহার খতিয়ান নং- ৩৪০৪৮ এবং জোত নং- ৭৫/৮১।
আবার একই মৌজার সিএস/এস এ খতিয়ান নং- ৩৪১, সি এস/ এস এস দাগ নং- ১৬২, আর এস খতিয়ান নং- ১৫৮৪, আর আস দাগ নং- ২২৬, মহানগর খতিয়ান নং- ১২২০৬ এবং মহানগর দাগ নং – ৭৩৫২ এর ০.০৪৮৮ একর সম্পত্তি গেজেটভুক্ত অর্পিত “ক” তফসিলের সম্পত্তি হওয়াও সত্ত্বেও ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, তারিখ ২৭১১/১৮-১৯ নং নামজারির কেস মূলে মোঃ জাকিরুল ইসলাম গংদের নামে নামজারি করে দেন।
উত্তরা থানাধীন ফয়দাবাদ মৌজার ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধিনস্থ ভূমি সংস্কার বোর্ডের নামে রের্কডকৃত মহানগর জরিপ খতিয়ান নং- ২৫ এবং মহানগর দাগ নং- ২০০০৪ এর ০.০৪৩৬ একর জমি নিন্ম আদালতের একটি মামলার রায় দেখিয়ে মীর আব্দুর রউফ এর নামে নামজারি করা হয়।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে বিশ্ব ইজতেমার মাঠের জমি নিয়ে। রানাভোলা মৌজায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এর নামে রের্কডকৃত বিশ্ব ইজতেমার মাঠের জমি মহানগর জরিপ খতিয়ান নং- ২ এবং মহানগর দাগ নং- ১০৫ এর ১.১২৫০ একর সম্পত্তি গোলাম নবিসহ মোট সাতজনের নামে নামজারি করে দেওয়া হয়। বিরাট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এ কাজ করা হয় বলে জানা যায়। এ ঘটনায় স্থানীয় মুসল্লিদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে বলে জানা যায়।
উল্লেখ্য, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন ম্যানুয়াল অনুযায়ী কোন সরকারী মালিকানাধীন সম্পত্তির নামজারি করতে হলে ভূমি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও মালিকানাধীন মন্ত্রণালয়/ সংস্থার অনুমতি গ্রহন বাধ্যতামূলক। এমনকি মামলায় উচ্চ আদালতের রায় থাকলে সেক্ষেত্রেও অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু উপরোক্ত কোন নামজারির ক্ষেত্রে কোন অনুমতি নেওয়া হয় নাই বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে মোঃ আবু ফাত্তাহ এর অভিযোগে বলা হয়, চরম প্রশাসনিক অনিয়মের এ বিষয়টি গত ২৭ শে জুন ২০১৯্ইং তারিখে ঢাকার জেলা প্রশাসক জনাব আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদোস খানের ক্যান্টমেন্ট রাজস্ব সার্কেল পরিদর্শনের সময় ধরা পরলে তিনি পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, “এ অফিসে কর্মরত কর্মচারীদের মাঝে দায়িত্ব বন্টন করা আছে এবং দায়িত্ব বন্টন আদেশ দেখা গেল। দায়িত্ব বন্টনাদেশে দেখা যায়, জনাব মোঃ শফিউল আলম, সার্ভেয়ার অত্রাফিসে কানুনগো হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। যা ভূমি মন্ত্রণালয়ের ৩১.০০.০০০০.০৪৬.৬৮.০৩৯.১২.৪৪৮ ; তারিখ: ২৫/০৫/২০১৭ তারিখের স্মারকের অফিস আদেশ অনুযায়ী সঠিক প্রতীয়মান হচ্ছে না।” উল্লেখ্য ১নং সূত্রে উল্লেখিত ভূমি মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের ‘চ’ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ”কানুনগো এর অনুপস্থিতিতে কর্মরত সার্ভেয়ারগণের মধ্যে হতে সিনিয়র সার্ভেয়ার কানুনগোর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করবে।” এবং ২নং সূত্রে উল্লেখিত ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার নিদের্শনায় বলা হয়েছে, ’’ জেলা প্রশাসকের নিকট হইতে প্রাপ্ত মতামতের প্রেক্ষিতে তার জেলার যে সকল উপজেলা ভূমি অফিস / রাজস্ব সার্কেলে কানুনগো এর পদ শূণ্য রয়েছে সে সকল উপজেলা / রাজস্ব সার্কেলে কর্মরত জ্যেষ্ঠ সার্ভেয়ারকে কানুনগো এর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের আদেশ প্রদান করার জন্য অনুরোধ করা হলো। এবং একই সাথে অত্র কার্যালয়ের ২৪/০৩/২০১৬ ইং তারিখের ০৫.৪১.৩০০০.০০৯.০৬.০৪৮.-১৪-২৪৭(১৩) নং স্মারক পত্রটি বাতিল করা হলো।
উল্লেখিত দু’টি পরিপত্র / নির্দেশনা ও জেলা প্রশাসকের পরির্দশন প্রতিবেদনের মন্তব্য / সুপারিশ সংশ্লিষ্ট কর্মকতা কর্তৃক বাস্তবায়ন না হওয়া একটি চরম অনিয়ম এবং সার্ভেয়ার শফিউল আলম সংশ্লিষ্ট কর্মকতাদের ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকতারা কার্যকর কোন ভূমিকা নিচ্ছেন না।
অন্যদিকে, সার্ভেয়র শফিউল আলম ক্যান্টমেন্ট সার্কেলের বিভিন্ন মৌজায় সরকারী মালিকানাদীন জমির ব্যক্তি মালিকানায় নামজারী করছেন। এর ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। উদাহরণ হিসাবে অভিযোগে বাইলজুরী মৌজায় নামজারী সংক্রান্ত একটি অনিয়ম উল্লেখ করা হয়। উক্ত মৌজায় এল, এ কেস নং ৭/২০০০-২০০১ এ হুকুম দখলকৃত আর এস ১৬৯১ নং দাগের হুকুম দখলকৃত .৮২ শতাংশের মধ্যে ৯.৯০ শতক জমি মোঃ আমির আলী খানের নামে নামজারী করা হয়েছে। যার নামজারী মোক্দ্দমা নং ১২৪১৭/১৭-১৮। উক্ত সম্পত্তি রাজউক উত্তরা তৃতীয় প্রকল্পের জন্য হুকুম দখল করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে বিরাট অংকের টাকার বিনিময়ে এ জমি নামজারী করা হয়েছে। উক্ত নামজারীকৃত সম্পত্তির বিপরীতে ব্যাংক থেকে ঋন নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সরকারি আদেশ/নির্দেশনা অমান্য করে একই পদে শফিউলকে রাখার ব্যাপারে ঐ সার্কেলের সাবেক এসি ল্যান্ড আতিকুল ইসলাম (বর্তমানে টাঙ্গাইল সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) ও বর্তমান এসি ল্যান্ড রিফাত ফেরদৌস এর ভূমিকা রয়েছে। তারা রহস্যজনক কারনে শফিউলকে ক্যান্টনমেন্ট সার্কেলে ৩টি পদের দায়িত্ব দিয়ে রাখার ব্যাপারে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তদবির করছেন এবং প্রশাসনকে ভুল বুঝাচ্ছেন। ইতিপূর্বে শফিউল ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভূমি মন্ত্রনালয় ও জেলা প্রশাসক, ঢাকা এর কার্যালয় একাধিক অভিযোগ দায়ের করা হলেও তিনি ও তার সহযোগিরা তা ম্যানেজ করেন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ৭ই অক্টোবর ঢাকার জেলা প্রশাসক বিভিন্ন সার্কেল থেকে ৭ জন সার্ভেয়ারকে বদলি করেন কিন্তু শফিউলের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে বদলি করা হয়নি বা তার বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে সার্ভেয়ার মোঃ শফিউল আলম বলেন, এ বিষয়ে কাগজ পত্র না দেখে কিছু বলা যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *